Sunday February 2026

হটলাইন

কনটেন্টটি শেষ হাল-নাগাদ করা হয়েছে: মঙ্গলবার, ৩০ ডিসেম্বর, ২০২৫ এ ০২:২৫ PM

উফশী ও আধুনিক ধান বলিতে কি বুঝায়?

কন্টেন্ট: খবর প্রকাশের তারিখ: ২৫-০৩-২০২৫ আর্কাইভ তারিখ: ২৫-০২-২০২৭

ভূমিকা

ধান আমাদের প্রধান খাদ্যশস্য। তাই এর সাথে দেশের অর্থনীতি ও সংস্কৃতি ওতপ্রোতভাবে জড়িত । ঘন বসতিপূর্ণ এ দেশের জনসংখ্যা ক্রমেই বেড়ে চলছে, অপরদিকে বাড়িঘর, কলকারখানা, হাট-বাজার, সড়ক-জনপথ স্থাপন এবং নদী ভাঙ্গন ইত্যাদি কারণে আবাদি জমির পরিমাণ প্রতিনিয়ত কমছে। তদুপরি রয়েছে খরা, বন্যা, জোয়ার-ভাটা, লবণাক্ততা, শৈত্য প্রবাহ ও শিলাবৃষ্টির মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ । এসব প্রতিকূলতা মোকাবিলা করে নির্দিষ্ট পরিমাণ জমিতে বেশি ধান উৎপাদন করে দেশের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা আমাদের লক্ষ্য । বাংলাদেশ পৃথিবীর ধান উৎপাদনকারী দেশ গুলোর মধ্যে চতুর্থ হলেও এখানকার হেক্টর প্রতি গড় ফলন ৪.২ টন। চীন, জাপান ও কোরিয়ায় এ ফলন হেক্টর প্রতি ৬-৬.৫ টন। দেশের ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার খাদ্য চাহিদার সাথে সঙ্গতি রেখে ধানের ফলন বাড়ানো ছাড়া কোন বিকল্প নেই। সনাতন জাতের ধান এবং মান্ধাতার আমলের আবাদ পদ্ধতির মাধ্যমে এ চাহিদা পূরণ করা অসম্ভব। এজন্য প্রয়োজন উচ্চ ফলনশীল (উফশী) ধান ও আধুনিক উৎপাদন প্রযুক্তির ব্যাপক প্রচলন । বাংলাদেশে ১৯৬৮ সালে আন্তর্জাতিক ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ইরি) থেকে প্রথম উফশী জাতের ধান (আইআর ৮) মাঠ পর্যায়ে চাষাবাদ শুরু হয়। খাটো আকৃতির এ উফশী ধান থেকে প্রতি হেক্টরে ৫-৬ টন (বিঘাপ্রতি ১৮-২১ মণ) ফলন পাওয়া যায়। তখন থেকে উফশী ধান লোকমুখে ইরি ধান নামে পরিচিতি লাভ করে । বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট (ব্রি) ১৯৭০ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে মৌসুম ও পরিবেশ উপযোগী উফশী ধানের জাত এবং ধান উৎপাদন বৃদ্ধির জন্য ফসল, মাটি, পানি, সার ইত্যাদি বিষয়ক কলা-কৌশল উদ্ভাবন করছে। বর্তমানে ব্রি উদ্ভাবিত ধানের জাত দেশের মোট ধানি জমির শতকরা প্রায় ৮০ ভাগে চাষাবাদ করা হচ্ছে এবং এ থেকে পাওয়া যাচ্ছে মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৯০ ভাগ । ব্রি ধান এভাবে ইরি ধানের ̄স্থলাভিষিক্ত হয়েছে । আমাদের সৃষ্ট ওয়েব সাইটে ধানের উন্নত জাত ও এদের উৎপাদনশীলতা সম্পর্কে তথ্য দেয়া আছে । আমরা আশা করি এসব তথ্য প্রয়োগ করে ব্যবহারকারীগণ উপকৃত হবেন:

১. বাংলাদেশের প্রধান খাদ্য শস্য কি?

• ধান বাংলাদেশের প্রধান খাদ্য শস্য।


২. বাংলাদেশে ধানের গড় ফলন কত?

• ধান উৎপাদনকারী দেশগুলোর মধ্যে চতুর্থ হলেও এখানকার হেক্টর প্রতি গড় ফলন ৪.২ টন। চীন, জাপান ও কোরিয়ায় এ ফলন হেক্টর প্রতি ৬-৬.৫ টন।


৩. উফশী ও আধুনিক ধান বলিতে কি বুঝায়?

• যে ধান গাছের সার গ্রহণ ক্ষমতা অধিক এবং ফলন বেশি তাকেই উফশী ধান বলা হয়। উফশী ধানের বিশেষ বৈশিষ্ট্য হল ধান পেকে গেলেও গাছ সবুজ থাকে। উফশী ধানের প্রয়োজনীয় বিশেষ গুণ, যেমন স্বল্প জীবনকাল এবং রোগবালাই, খরা, লবণাক্ততা ও জলমগ্নতা ইত্যাদি সহনশীলতা সংযোজিত হয় তখন তাকে আধুনিক ধান বলা হয়। তাই সকল উফশী ধান আধুনিক নয় কিন্তু সকল আধুনিক ধানে উফশী গুণ বিদ্যমান।


৪. বাংলাদেশে কোন কোন মৌসুমে ধান চাষ করা যায়?

• আউশ, আমন ও বোরো মৌসুমে ধানের চাষাবাদ হয়।


৫. আউশ মৌসুমে কি কি উফশী ধানের চাষ করা যায়?

• আউশ মৌমুম: এ মৌসুমে বপন ও রোপন দু’ভাবেই ধান আবাদ করা যায়। আউশ ধানের বীজ বপনের উপযুক্ত সময় হল ১৫-৩০ চৈত্র। বোনা আউশের উফশী জাতগুলো হল বিআর২১, বিআর২৪, ব্রি ধান২৭, ব্রি ধান৪২ এবং ব্রি ধান৪৩। রোপা আউশের জাতগুলো হল বিআর২৬, ব্রি ধান২৭, ব্রি ধান৪৮ এবং ব্রি ধান৫৫।


৬. আমন মৌসুমে কোন ধরনের জাতগুলো চাষ করা যায়?

• রোপা আমন ধানের জাতগুলোর মধ্যে আলোক-সংবেদনশীলতা ও জাত নির্বাচন বিবেচনা করা জরুরী। সুগন্ধি পোলাও ও বিরিয়ানির চালের জন্য বিআর৫, ব্রি ধান৩৪, ব্রি ধান৩৭ এবং ব্রি ধান৩৮ অন্যতম। অধিক ফলনশীল মাঝারি মোটা থেকে মোটা চালের জন্য বিআর১০, বিআর১১, ব্রি ধান৩০ ও ব্রি ধান৩১ চাষ করতে হবে। আগাম জাত হিসাবে বিআর২৫, ব্রি ধান৩২, ব্রি ধান৩৩, ব্রি ধান৩৯ ও ব্রি ধান৪৯ এবং বিনাধান৭ অত্যন্ত উপযোগী। বন্যামুক্ত এলাকায় উফশী ব্রি হাইব্রিড ধান৪-এর চাষ করা যেতে পারে। জলমগ্নতা-সহনীয় জাত হিসাবে ব্রি ধান৫১ ও ব্রি ধান৫২-এর চাষ করা যেতে পারে। মাঝারি মোটা থেকে লম্বা মোটা চাল এবং নাবি জাত হিসাবে বিআর২২, বিআর২৩ এবং ব্রি ধান৪৬-এর চাষ করা যেতে পারে। চারা ও প্রজনন অবস্থায় ৮-১০ ডিএস/মিটার লবণাক্ততা-সহনশীল জাত হিসাবে ব্রি ধান৪০, ব্রি ধান৪১, ব্রি ধান৫৩, ব্রি ধান৫৪, বিনাধান৮ ও বিনাধান১০ সবচেয়ে উপযুক্ত জাত। মোটা চাল এবং জোয়ার-ভাটা পরিবেশের ধান হিসাবে ব্রি ধান৪৪ ছাড় করা হয়েছে।


৭. বোরো মৌসুমে উফশী ধান কোনগুলো?

• বোরো মৌসুমের জাতগুলোতে কোন আলোক-সংবেদনশীলতা নেই। এ মৌসুম শুরু হয় ঠান্ডা ও ছোট দিন দিয়ে, আর ফুল ফোঁটে গরমের শুরুতে এবং বড় দিনে । তাই আলোক-সংবেদনশীল কোন জাত বোরো মৌসুমে আবাদযোগ্য নয়। বোরো মৌসুমে চাষাবাদ উপযোগী আগাম জাতগুলো হল বিআর১, বিআর৬, ব্রি ধান২৮, ব্রি ধান৪৫ এবং ব্রি ধান৫৫। উফশী ও দীর্ঘ জীবনকাল বোরো মৌসুমে চাষযোগ্য জাতগুলোর মধ্যে বিআর১৪, বিআর১৬, ব্রি ধান২৯, ব্রি ধান৫৯, ব্রি ধান৬০ এবং ব্রি হাইব্রিড ধান১ অন্যতম।


৮. ব্রি ধান২৮-এর পরিবর্তে আগাম কোন জাতের ধান চাষ করা যায়?

• ব্রি হাইব্রিড ধান২ এবং ব্রি হাইব্রিড ধান৩-এর চাষ করে অধিক ফলন পাওয়া যায়।


৯. ঠান্ডা-সহনীয় ও আগাম জাত কোনটি?

• ব্রি ধান৩৬।


১০. হাওর এলাকার উপযোগী ধানের জাত কোনগুলো?

• বিআর১৭, বিআর১৮ এবং বিআর১৯।


১১. শিলাবৃষ্টি-প্রবণ এলাকার উপযোগী জাত কোনটি?

• বিআর৮ এবং বিআর৯।


১২. লবণাক্ততা-সহনশীল জাত কোনগুলো?

• ব্রি ধান৪৭, ব্রি ধান৬১, ব্রি ধান৮ এবং বিনাধান১০।


১৩. উফশী ধানের মধ্যে সুগন্ধি ধান কোনটি?

• ব্রি ধান৫০ (বাংলামতি)।


১৪. মধ্যম মানের লবণাক্ততা, খরা এবং ঠান্ডা সহনশীল জাত কোনটি?

•ব্রি ধান৫৫।


১৫. উর্বর জমি ও পানি ঘাটতি নেই এমন সব এলাকার জন্য অধিক ফলনশীল জাত হিসাবে কোন কোন ধানের চাষ করলে বেশি লাভবান হওয়া যাবে?

•ব্রি ধান৫৮ যার জীবনকাল ব্রি ধান২৮ এর চেয়ে ৬-৭ দিন বেশি। এটি নাবি কিন্তু ব্রি ধান২৯ এর চেয়ে ৭-৮ দিন আগে পাঁকে।




ধান চাষের উন্নত পদ্ধতি



বীজ বাছাই


১৬. বীজ বাছাইয়ের জন্য কি কি করনীয়?

•দশ লিটার পরিষ্কার পানিতে ৩৭৫ গ্রাম ইউরিয়া সার মেশাতে হবে। এবার ১০ কেজি বীজ ঐ পানিতে দিয়ে নাড়তে হবে। পুষ্ট বীজ ডুবে নিচে জমা হবে এবং অপুষ্ট ও হালকা বীজ পানির উপরে ভেসে উঠবে। হাত অথবা চালনি দিয়ে ভাসমান বীজগুলো সরিয়ে ফেলতে হবে। ভারী বীজ নিচ থেকে তুলে নিয়ে পরিষ্কার পানিতে ৩-৪ বার ভাল করে ধুয়ে নিতে হবে। ইউরিয়া মিশানো পানি সার হিসাবে বীজতলায় ব্যবহার করা যেতে পারে।


১৭. বীজ শোধন ও জাগ দেয়ার পদ্ধতি কি?

• বাছাইকৃত বীজ দাগমুক্ত ও পরিপুষ্ট হলে সাধারনভাবে শোধন না করলেও চলে। তবে শোধনের জন্য ৫২-৫৫ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রায় গরম পানিতে ১৫ মিনিট বীজ ডুবিয়ে রাখলে জীবাণুমুক্ত হয়। বীজ যদি দাগমুক্ত হয় এবং বাকানি আক্রমণের আশঙ্কা থাকে তাহলে কারবেনডাজিম-জাতীয় ছত্রাকনাশক দিয়ে বীজ শোধন করা যায়। ক্ষেতে ২-৩ গ্রাম ছত্রাকনাশক ১ লিটার পানিতে ভালভাবে মিশিয়ে ১ কেজি পরিমান বীজ পানিতে ডুবিয়ে নাড়াচাড়া করে ১২ ঘন্টা রেখে দিতে হবে। এরপর বীজ পরিষ্কার পানিতে ধুয়ে পানি ঝরিয়ে নিতে হবে। এভাবে শোধনকৃত বীজ বাঁশের টুকরি বা ড্রামে ২/৩ পরত শুকনো খর বিছিয়ে তার উপর বীজের ব্যাগ রাখুন এবং আরও ২/৩ পরত শুকনো খর দিয়ে ভালভাবে চেপে তার উপর ইট বা কোন ভারী জিনিস দিয়ে চাপ দিয়ে রাখুন। এভাবে জাগ দিলে আউশ ও আমন মৌসুমের জন্য ৪৮ ঘন্টা, বোরো মৌসুমে ৭২ ঘন্টার মধ্যে ভাল বীজের অঙ্কুর বের হবে এবং বীজতলায় বপনের উপযুক্ত হবে।


১৮. আদর্শ বীজতলা তৈরীর নিয়ম কি?

•দো-আশ ও এটেল মাটি বীজতলার জন্য ভাল। জমি অনুর্বর হলে প্রতি বর্গমিটারে ২ কেজি হারে জৈব সার মেশানো যেতে পারে। এরপর জমিতে ৫-৬ সেঃমিঃ পানি দিয়ে ২/৩টি চাষ ও মই দিয়ে ৭-১০ দিন রেখে দিতে হবে। আগাছা ও খড় ইত্যাদি পচে গেলে আবার চাষ ও মই দিয়ে কাদা করে জমি তৈরী করতে হবে। এবার জমির দৈর্ঘ বরাবর ১মিঃ চওড়া বেড তৈরী করতে হবে। দু’বেডের মাঝে ২৫-৩০ সেঃমিঃ জায়গা ফাঁকা রাখতে হবে। নির্ধারিত জমির দু’পাশের মাটি দিয়ে বেড তৈরী করতে হবে। এরপর উপরের মাটি ভালভাবে সমান করে ৩/৪ ঘন্টা পর বীজ বোনা উচিত।


১৯. বীজতলায় বীজ বপনের আদর্শ পদ্বতি কি?

• প্রতি বর্গমিটার বেডে ৮০-১০০ গ্রাম বীজ বোনা দরকার। বপনের সময় থেকে ৪/৫ দিন পাহাড়া দিয়ে পাখি তাড়ানোর ব্যবস্থা করতে হবে এবং নালা ভর্তি পানি রাখতে হবে।


২০. অতিরিক্ত ঠান্ডায় বীজতলায় কি যত্ন নিতে হবে?

•শৈত্য প্রবাহের সময় বীজতলা স্বচ্ছ পলিথিন দিয়ে সকাল ১০টা থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত ঢেকে দিলে, বীজতলার পানি সকালে বের করে দিয়ে আবার নতুন পানি দিলে, প্রতিদিন সকালে চারার উপর জমাকৃত শিশির ঝরিয়ে দিলে ধানের চারা ঠান্ডার প্রকোপ থেকে রক্ষা পায়।



ফাইল ১

এক্সেসিবিলিটি

স্ক্রিন রিডার ডাউনলোড করুন